
জাহিদুর রহমান বকুল:
গাজীপুরের প্রহলাদপুর এলাকার বনখড়িয়া গ্রামে এখনো টিকে আছে গ্রামীণ জীবনের এক প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী চিত্র—মাটির চুলোয় রান্না। আধুনিকতার ছোঁয়ায় যখন শহর ও গ্রামের অধিকাংশ মানুষ গ্যাস বা বৈদ্যুতিক চুলার দিকে ঝুঁকছে, তখনও এই গ্রামের অনেক পরিবার তাদের দৈনন্দিন রান্নার কাজে ব্যবহার করছে মাটির তৈরি চুলো।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বনখড়িয়া গ্রামটি ভাওয়াল শালবনের কাছাকাছি হওয়ায় এখানে সহজেই পাওয়া যায় শালবনের ঝরা পাতা, শুকনো ডালপালা ও অন্যান্য প্রাকৃতিক জ্বালানি। শুধু বনখড়িয়াই নয়, আশেপাশের বিভিন্ন এলাকার মানুষও এই ঝরা পাতা ও ডালপালা সংগ্রহ করে রান্নার কাজে ব্যবহার করছে। ফলে অনেক পরিবারকে আলাদা করে জ্বালানি কিনতে হয় না, যা তাদের জন্য আর্থিকভাবে বড় স্বস্তি নিয়ে এসেছে।
গ্রামের বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মাটির চুলো শুধু খরচ সাশ্রয়ীই নয়, বরং এতে রান্না করা খাবারের স্বাদও তুলনামূলকভাবে বেশি সুস্বাদু হয়। বিশেষ করে ভাত, ভর্তা বা দেশীয় বিভিন্ন রান্না এই চুলোয় করলে আলাদা এক ধরনের ঘ্রাণ ও স্বাদ পাওয়া যায়, যা আধুনিক চুলায় অনেক সময় পাওয়া যায় না।
এছাড়াও, অনেকেই মনে করেন মাটির চুলো পরিবেশবান্ধব একটি পদ্ধতি। কারণ এতে প্রাকৃতিক উপকরণ ব্যবহার করা হয় এবং ভাওয়াল শালবনের ঝরা পাতা পুনর্ব্যবহারের মাধ্যমে এক ধরনের প্রাকৃতিক ভারসাম্যও বজায় থাকে। তবে কিছু ক্ষেত্রে ধোঁয়ার কারণে স্বাস্থ্যঝুঁকির কথাও উঠে এসেছে, বিশেষ করে ঘরের ভেতরে চুলো ব্যবহার করলে নারী ও শিশুদের জন্য তা কিছুটা কষ্টদায়ক হয়ে দাঁড়ায়।
গ্রামের প্রবীণরা জানান, এই পদ্ধতি তাদের পূর্বপুরুষদের সময় থেকেই চলে আসছে। এটি শুধু রান্নার মাধ্যম নয়, বরং গ্রামীণ সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক পরিবার আধুনিক চুলার দিকে ঝুঁকলেও, বনখড়িয়া ও এর আশপাশের এলাকার অনেক মানুষ এখনো আগলে রেখেছে তাদের এই পুরনো জীবনধারা।
তবে নতুন প্রজন্মের মধ্যে ধীরে ধীরে পরিবর্তনের প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। শিক্ষা, প্রযুক্তি ও আধুনিক সুবিধার প্রসারের ফলে তরুণরা গ্যাস ও বৈদ্যুতিক চুলার প্রতি বেশি আগ্রহী হচ্ছে। তারপরও অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও সহজলভ্যতার কারণে এসব এলাকার একটি বড় অংশ এখনো নির্ভর করছে মাটির চুলোর ওপর।
সব মিলিয়ে বলা যায়, গাজীপুরের বনখড়িয়া ও আশপাশের এলাকায় মাটির চুলো এখনো শুধু একটি রান্নার উপকরণ নয়, বরং এটি একটি জীবনধারা, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে টিকে আছে এবং গ্রামীণ পরিবেশ ও ঐতিহ্যের একটি জীবন্ত নিদর্শন হিসেবে আজও বহমান।