
জাহিদুর রহমান বকুল:
গাজীপুর মহানগরের পূবাইল কলেজ গেট এলাকায় অবস্থিত পুরোনো টায়ার থেকে তেল উৎপাদনকারী কারখানা অটো গ্রিন অয়েল-এ আবারও বয়লার বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে।
শনিবার (২০ জুন) দুপুরে বিকট শব্দে বিস্ফোরণের পর কারখানাজুড়ে আগুন ছড়িয়ে পড়লে এলাকাজুড়ে আতঙ্কের সৃষ্টি হয়। খবর পেয়ে টঙ্গী ফায়ার সার্ভিসের তিনটি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে প্রায় এক ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। সৌভাগ্যবশত এ ঘটনায় কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কারখানাটিতে বয়লারের মাধ্যমে পুরোনো ও পরিত্যক্ত টায়ার গলিয়ে তেল উৎপাদন করা হয়। শনিবার দুপুরে হঠাৎ বয়লার বিস্ফোরিত হলে মুহূর্তের মধ্যে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। বিস্ফোরণের শব্দ আশপাশের এলাকায়ও শোনা যায় এবং আতঙ্কিত হয়ে পড়েন স্থানীয় বাসিন্দারা।
টঙ্গী ফায়ার সার্ভিসের সিনিয়র স্টেশন অফিসার শাহীন আলম জানান, প্রাথমিকভাবে বয়লার বিস্ফোরণ থেকেই আগুনের সূত্রপাত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন। এতে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।
যে কারখানার ইতিহাস জুড়ে রয়েছে মৃত্যু ও বিস্ফোরণের স্মৃতি:
বর্তমানে অটো গ্রিন অয়েল নামে পরিচালিত এই কারখানাটি একসময় স্মার্ট মেটাল অ্যান্ড কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ নামে পরিচিত ছিল। স্থানীয়দের কাছে এটি বহু বছর ধরেই ঝুঁকিপূর্ণ শিল্পপ্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত।
২০১৬ সালের ভয়াবহ বিস্ফোরণ:
২০১৬ সালের ২৩ জানুয়ারি একই স্থানে অবস্থিত তৎকালীন স্মার্ট মেটাল অ্যান্ড কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজে ভয়াবহ বয়লার বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। বিস্ফোরণের পর আগুন ছড়িয়ে পড়ে এবং ঘটনাস্থল রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। প্রথমদিকে কয়েকজন নিহত হলেও পরবর্তীতে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও কয়েকজনের মৃত্যু হলে নিহতের সংখ্যা বেড়ে অন্তত ৮ জনে পৌঁছায়।সেই দুর্ঘটনায় শুধু কারখানার শ্রমিকরাই নন, পথচারীরাও প্রাণ হারান। নিহতদের মধ্যে ছিলেন বড়ইবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা সিদ্দিকা জেবুন্নেছা (ডলি)। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, বিস্ফোরণের সময় তিনি রিকশাযোগে কারখানার সামনের সড়ক দিয়ে যাচ্ছিলেন। বিস্ফোরণের পর ছিটকে আসা আগুন ও দাহ্য পদার্থে দগ্ধ হয়ে তিনি ঘটনাস্থলেই মারা যান। এছাড়া এক রিকশাচালকসহ আরও কয়েকজন সাধারণ মানুষও ওই দুর্ঘটনার শিকার হন।
ঘটনাটি সে সময় দেশব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। জনবসতিপূর্ণ এলাকায় এমন ঝুঁকিপূর্ণ কারখানার নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে ব্যাপক প্রশ্ন ওঠে। দুর্ঘটনার পর জেলা প্রশাসন কারখানাটি সিলগালা করে বন্ধ করে দেয় এবং তদন্ত কার্যক্রম শুরু হয়।
নতুন নামে ফের কার্যক্রম
কিছুদিন বন্ধ থাকার পর কারখানাটি নতুন ব্যবস্থাপনায় অটো গ্রিন অয়েল নামে পুনরায় কার্যক্রম শুরু করে। স্থানীয়দের অভিযোগ, নতুন নামে চালু হলেও কারখানার মূল কার্যক্রমে তেমন কোনো পরিবর্তন আসেনি। বরং কারখানার চারদিকে উঁচু প্রাচীর নির্মাণ করা হয়েছে, ফলে ভেতরের কার্যক্রম বাইরে থেকে দেখা যায় না।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, অতীতে প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার পরও একই স্থানে পুনরায় ঝুঁকিপূর্ণ কার্যক্রম চালানোর অনুমতি কীভাবে দেওয়া হয়েছে, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
আবারও নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন:
২০১৬ সালের ভয়াবহ বিস্ফোরণে শ্রমিক, পথচারী, একজন স্কুল শিক্ষিকা ও সাধারণ মানুষ নিহত হওয়ার ঘটনার এক দশক পার না হতেই একই কারখানায় আবারও বয়লার বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটল। যদিও এবার বড় ধরনের প্রাণহানি ঘটেনি, তবুও পুরোনো সেই বিভীষিকার স্মৃতি ফিরে এসেছে এলাকাবাসীর মনে।
স্থানীয়দের দাবি, কারখানাটির নিরাপত্তা ব্যবস্থা, পরিবেশগত অনুমোদন, বয়লারের মান এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদারকি নিয়ে নতুন করে তদন্ত হওয়া উচিত। একই স্থানে বারবার বিস্ফোরণের ঘটনা প্রমাণ করে যে নিরাপত্তা ঝুঁকি এখনও পুরোপুরি দূর হয়নি।
এলাকাবাসীর প্রশ্ন—২০১৬ সালের সেই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় আটটি প্রাণ হারানোর পরও কেন এই কারখানাকে ঘিরে ঝুঁকির অবসান হলো না? শনিবারের বিস্ফোরণের পর সেই প্রশ্নই আবারও জোরালোভাবে সামনে এসেছে।