মো: নোমান ইসলাম বিরামপুর (দিনাজপুর) প্রতিনিধিঃ
দিনাজপুরের বিরামপুর উপজেলার ৩নং খানপুর ইউনিয়নে অবস্থিত রক্ষুনী কান্ত বাবুর জমিদার বাড়ী ধ্বংসের পথে। হতে পারতো এখানে পর্যটন কেন্দ্র রক্ষণাবেক্ষনের অভাবে আজ তার ধ্বংসের দিকে পতিত হচ্ছে। জানালা, দরজা কিছুই নেই, নেই প্রবেশের বাঁধা অভিভাবকহীন চমকপ্রদ এই সু-দৃশ্য দ্বিতল অট্টালিকাটিতে অনেকটা ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে স্থানীয়রা। তারা রাতের আঁধারে সবই খুলে নিয়ে গিয়েছেন। তবে অনেকটা সুরক্ষিত রয়েছে কংক্রিটের দেয়ালের ইটগুলো। নিপুণ হাতের গাঁথুনির দেয়ালের ইটগুলো এখনো অনেকটা চকচকেই রয়ে গেছে। স্তরে স্তরে সাজানো দ্বিতল ভবনের ১৪টি ঘরের দেয়াল, ছাদে রয়েছে অনেক নিদর্শন। বর্তমান সিঁড়িটি স্থাপত্বের একটি নিদর্শন মাত্র। তবে আগের মতো যৌলুশ নেই, নেই কর্তা বাবুদের নজরদারি। সংস্কার আর নজরদারির অভাবে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন স্বরূপ রক্ষুনী কান্ত বাবুর জমিদার বাড়িটি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। তবুও প্রতিদিনই এখানে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসেন সৌন্দর্য পিপাসু অনেক দর্শনার্থী ও পর্যটকরা।
জমিদার বাড়িটির ইতিহাস:
ইতিহাস ঐতিহ্য সমৃদ্ধ দিনাজপুর জেলার বিরামপুর উপজেলার রয়েছে বহু দর্শনীয় স্থান। উপজেলার খানপুর ইউনিয়নের রতনপুর বাজারের উত্তর পার্শ্বে অবস্থিত এই প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন স্বরূপ জমিদার বংশের যুগযুগ ধরে কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তথ্যনুযায়ী জানাযায়, বিরামপুর সহ আশেপাশে অঞ্চলগুলোতে প্রজাদের নিকট থেকে খাজনা আদায় করার জন্য অষ্টাদশ শতকে ব্রিটিশরা
ফুলবাড়ী জমিদার বাড়ির পক্ষে রাজকুমার সরকারকে রতনপুর কাচারীতে প্রেরণ করেন। কিন্তু রাজকুমারের মেধা চতুরতা আর কৌশলতায় তার ভাগ্যের চাকা বদলে জীবনের মোড়ে ঘুরিয়ে দিয়ে ছিল। অবাক ব্যাপার যে, রাজকুমারের খাজনা আদায়ে পারদর্শিতায় ও নৈপুণ্যে জমিদার সাড়ে ৬শ বিঘা জমি উপহারসহ তার নিজের বোনের সাথে রাজকুমারের বিয়ে দেন। আঙুল ফুলে কলাগাছের মত সৌভাগ্যক্রমে সাধারণ খাজনা আদায়কারী থেকে জমিদার বনে যান। শুধু তাই নয়, রাজকুমার অধিক অর্থসম্পদের লিন্সায় মেতে উঠে স্থানীয় রঘু হাসদা নামের এক অঢেল সম্পত্তির প্রতাপশালী সাঁওতালের কাছ থেকে ধার করে নেয়ার কথা বলে ৫ বস্তা কাঁচা টাকা দিয়ে অন্য জমিদারগণের নিকট ৩শ বিঘা জমি কিনে নেন। এ ঘটনায় ২ বছর পর রঘু হাসদার আড়াইশো বিঘার ফলের বাগান চতুরতায় কয়েদ করে নিয়ে অত্যন্ত সু-কৌশলে উপকারী রঘু হাসদাকে এলাকা থেকে বিতাড়িত করেন মোট ১২শ বিঘার ফলদ, বনজ ঔষধি জমির মালিক ধূর্ত রাজকুমার নামের নব্য জমিদার আরাম আয়েশের জন্য বিলাস বহুল অভিজাত চমকপ্রদ এই সু-দৃশ্য দ্বিতল অট্টালিকা নির্মাণ করেন। কিন্তু, তার এ সুখ বেশী দিন স্থায়ী হয়নি। জমিদারের দুই পুত্র রতন কুমার ও রক্ষুনী কান্ত বাবুর মধ্যে বড় ছেলে রতন কুমার ১৬ বছর বয়সে মন্দিরের পুষ্করিনীতে স্নান করতে গিয়ে ডুবে মারা যান। এতে পুত্রের অনাকাক্সিক্ষত বিয়োগান্তে জমিদার শোকে বিহব্বল আচ্ছন্নের মত নির্বিকার হন। যা পরবর্তীতে মানসিক ভাবে ভেঙ্গে পড়ে নিজের জীবন প্রদীপও নিভে যায়। পুত্র শোকে কাতরতায় অবসাদ- বিশাদগ্রস্ততায় আর হতাশায় জমিদারও মারা যান রতনপুর জমিদার বাড়ির পরবর্তি অধ্যায়ে উত্তরাধিকার হিসেবে পিতার মৃত্যুর পর ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রমার্ধে এক মাত্র পুত্র রক্ষুনী কান্ত বাবুই পৈত্রিক সূত্রে জমিদারী লাভ করেন ও মালিক হন এই জমিদার বাড়িটির। যতদূর জানা যায়, রক্ষুনী কান্ত বাবু জমিদারি থাকা কালীন সময়ে তার বাড়িতে ১০০ টি বিড়াল পুষে ছিলেন, যে বিড়াল গুলোর দুধের বাটি দিয়েও দুধ পান করত না যতক্ষণ পর্যন্ত মনিবের হুকুম না হত। জমিদার রক্ষুনী কান্তর দরবারে প্রতিবেশী কেউ গেলে প্রস্থানের পর উক্ত ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করে নেয়া হত। আরো জানাযায়, জমিদার রক্ষুনী কান্ত বাবুর কোন সন্তান ছিল না। কিন্তু, ১৯৭১ সালে এদেশে স্বাধীনতার যুদ্ধ শুরু হলে জমিদার রক্ষুনী কান্তর বাবু স্বস্ত্রীক নিয়ে একটি মহিষের গাড়িতে চড়ে রাতের আঁধারে কলকাতার উদ্দেশ্যে তার বংশধরদের কাছে পাড়ি দেন। জমিদার বাড়িটি ভূমি অফিস হিসেবে ব্যবহার হলেও ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় উত্তর পার্শ্বে আর একটি নতুন ভবন তৈরি করা হয়েছে। যেটি খানপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিস হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে। বর্তমান জমিদার রক্ষুনী কান্তর বাবুর জমিদার বাড়ির পাশে রয়েছে ইসলামিক মিশন, মাদ্রাসা, মসজিদ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান সহ বিলাস একটি পুকুর। বর্তমানে জমিদার রক্ষুনী কান্ত বাবুর ১২শ বিঘা জমি ফলদ, বনজ ও ঔষধি বাগান রক্ষণাবেক্ষণ ও তদারকির অভাবে সম্পত্তি বিলিন ও বেদখল হয়ে গেছে, যতটুকুর হদিস মিলেছে ততটুকুই দিনাজপুর জেলা প্রশাসক মহোদয় জমিদার রক্ষুনী কান্ত বাবুর সম্পত্তি ১ নম্বর খাস খতিয়ানে অন্তর্ভুক্তি করেছেন। লতায় পাতায় ছেয়ে যাওয়া জীর্ণ জঙ্গলময় ভুতুড়ে পরিত্যক্ত এই জমিদার বাড়িটি ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষার্থে সংস্কারের জন্য দিনাজপুর জেলা প্রশাসনের পক্ষে এর আগে উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। স্থানীয়রা জানান, বিরামপুর উপজেলার কোল ঘেঁষে আশুড়াল বিল দৃষ্টি নন্দন আঁকা বাঁকা কাঠের সেতু। দেশের যে কোন এলাকা থেকে পর্যটক আসলে যেন এক সাথে সব উপভোগ করতে পারে। সেই জন্য রতনপুর জমিদার বাড়িটি সংস্কার করে পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত করলে এই এলাকার কয়েক হাজার মানুষের কর্মস্থান সৃষ্টি হতে পারে।